বাংলালিংকের ভবিষ্যৎ এখন আর্থিক ঝুঁকির মুখে

0
43

মূল প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কেলেঙ্কারি ও নিজেদের বড় অংকের ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা সেলফোন অপারেটর বাংলালিংকের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলছে। গত এক বছরে বিপুল সংখ্যক কর্মী ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি নানা ধরনের ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে প্রতিষ্ঠানটি। তার পরও আগামী বছরগুলোয় বড় ধরনের আর্থিক চাপ অনিশ্চয়তা তৈরি করছে সেলফোন অপারেটরটির।

তহবিল সংগ্রহে ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঁচ বছর মেয়াদি ৩০ কোটি ডলার মূল্যের বন্ড ছাড়ে বাংলালিংক। এটি বাংলাদেশ থেকে প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক বন্ড ছাড়ার ঘটনা। এতে একমাত্র বুকরানার ও লিড ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্বে ছিল সিটি গ্রুপ। ওই বছরের ৬ মের মধ্যে বন্ডের লেনদেন সম্পন্নের ঘোষণা দেয়া হয়। এ বন্ডের রি-অফার প্রাইস ৯৯ দশমিক শূন্য শূন্য ৮ শতাংশ, যেটির ‘ইল্ড টু ম্যাচুরিটি’ ৮ দশমিক ৮৭৫ শতাংশ। সংগৃহীত অর্থ দিয়ে ঋণ পরিশোধ ও মূলধনি ব্যয় নির্বাহের লক্ষ্য নিয়ে এ বন্ড ছাড়ে বাংলালিংক। এটির মেয়াদ পূর্ণ হবে ২০১৯ সালের মে মাসে। এর বাইরে আরো ৫০ লাখ ডলার ঋণ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

এদিকে উজবেকিস্তানে লাইসেন্স পেতে ঘুষ দেয়ার অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় ৭৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার জরিমানা গুনতে হয়েছে বাংলালিংকের সিংহভাগ শেয়ারের মালিক ভিওনকে (ভিম্পেলকম)। ২০০৬-১১ সালের মধ্যবর্তী সময় উজবেকিস্তানে ব্যবসা সম্প্রসারণে অবৈধ লেনদেনের আশ্রয় নেয়া হয়েছিল। সহায়ক এক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশটির প্রেসিডেন্টের মেয়ে গুলনারার বন্ধু গায়ানে আভাকিয়ানের প্রতিষ্ঠান টাকিল্যান্ট লিমিটেডের সঙ্গে উেকাচের অর্থ লেনদেন করে ভিওন। অভিযোগে বলা হয়, লাইসেন্স পেতে উজবেকিস্তান কর্তৃপক্ষকে ১১ কোটি ৪০ লাখ ডলার উেকাচ দেয় প্রতিষ্ঠানটি। বিষয়টিকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ডাচ কর্তৃপক্ষের সন্দেহের তালিকায় ছিল ভিওন। দুর্নীতির এ অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মামলা নিষ্পত্তির জন্য ৭৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার জরিমানা প্রদানে সম্মতি জানায় ভিওন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা ও মূল প্রতিষ্ঠানের বড় অংকের জরিমানা পরিশোধের বিষয়টি আগামী দিনগুলোয় বাংলালিংকের জন্য আর্থিক সংকট তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি সরকার দেশে ফোরজি সেবা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। শিগগিরই সেবাটি চালু হলে তার আগে তরঙ্গ কিনতে ও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। এছাড়া ডিজিটালের জন্য বিনিয়োগও করতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে। আর এখনো মুনাফা অর্জন করতে না পারায় আর্থিক সংকট আরো ঘনীভূত হবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

২০০৫ সালে ১০ লাখ গ্রাহক সংখ্যা অর্জন করে বাংলালিংক। গ্রাহক সংখ্যার ভিত্তিতে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেলফোন অপারেটর হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আবির্ভাব ঘটে ২০০৭ সালে। ২০০৮ সালে এক কোটি গ্রাহকের মাইলফলক অর্জন করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে গত বছর রবি-এয়ারটেল একীভূতকরণের পর গ্রাহক সংখ্যার ভিত্তিতে দীর্ঘদিন দ্বিতীয় স্থানে থাকা বাংলালিংক নেমে আসে তৃতীয় স্থানে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি শেষে বাংলালিংকের গ্রাহক সংখ্যা ৩ কোটি ১৩ লাখ ছাড়ালেও কমেছে মার্কেট শেয়ার। বর্তমানে সেলফোন অপারেটরটির মার্কেট শেয়ার ২৪ দশমিক ১৬ শতাংশ, গত বছরের শুরুতেও যা ছিল ২৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে সেবা টেলিকমের শতভাগ শেয়ার কিনে নেয় মিসরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওরাসকম টেলিকম হোল্ডিংস (ওটিএইচ)। পরের বছর বাংলালিংক ব্র্যান্ড নামে সেবা চালু করে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১১ সালে ওটিএইচের সিংহভাগ শেয়ার কিনে নেয় ভিম্পেলকম। আর ২০১৩ সালে ওটিএইচের নাম পরিবর্তন করে গ্লোবাল টেলিকম হোল্ডিংস (জিটিএইচ) ও ওরাসকম বাংলাদেশ লিমিটেডের নাম বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশন্স লিমিটেড রাখা হয়।

বাংলালিংকের ২০১৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি দায় ছিল ৫ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা। আগের বছর এ দায় ছিল ৩ হাজার ৯০ কোটি টাকা। এছাড়া ২০১৪ সালে বাংলালিংকের চলতি দায়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২৬৮ কোটি ও ২০১৩ সালে ৫ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা।

পরবর্তী ১২ মাসের মধ্যে পরিশোধের বাধ্যবাধকতা নেই, এমন দায় প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি দায় হিসেবে পরিচিত। এর মধ্যে রয়েছে ডিবেঞ্চার, ঋণ, ডেফার্ড ট্যাক্স দায় ও পেনশন। আর এক বছরের মধ্যে পরিশোধযোগ্য দায়কে প্রতিষ্ঠানের চলতি দায় হিসেবে দেখানো হয়। স্বল্পমেয়াদি ঋণসহ অন্যান্য ঋণ এর অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে পাওনাদার ও সরবরাহকারীদের প্রাপ্য অর্থ।

এদিকে ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে কর্মী সংখ্যা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলালিংক। গত বছর একাধিক পর্যায়ে কর্মী ছাঁটাইয়ের এ কার্যক্রম শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। যদিও একে প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন কার্যক্রমের অংশ বলে দাবি করছে বাংলালিংক।

গত বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানের সব কর্মীর কাছে পাঠানো এক ই-মেইল বার্তায় স্বেচ্ছা অবসর কার্যক্রম (ভিএসএস) চালুর বিষয়টি জানান বাংলালিংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এরিক অস। ওই দফায় প্রথমে ৪৬৮ জন কর্মীকে বিদায় দেয়া হয়। পরে আরো চার কর্মী এ প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যান। এর পর ওই বছরের নভেম্বরে ৫০৯ জন দ্বিতীয় দফার ভিএসএস কার্যক্রমের আওতায় বিদায় নেন। এছাড়া আরো ১০৪ জন কর্মী অনিশ্চয়তায় বাংলালিংক ছেড়েছেন। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চলতি বছর শেষে বাংলালিংকের কর্মী সংখ্যা ৫০০-এর নিচে নামিয়ে আনা হবে বলে জানা গেছে।

গ্লোবাল টেলিকম হোল্ডিংসের (জিটিএইচ) মালিকানাধীন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও চলছে একই ধরনের ব্যয় সংকোচন প্রক্রিয়া। এর অংশ হিসেবে কর্মী সংখ্যা কমিয়ে আনার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে তারা। প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের কথা বলে ২০১৩ সালে তিন দফায় প্রায় ৩০০ কর্মী ছাঁটাই করে পাকিস্তানের শীর্ষ সেলফোন অপারেটর মোবিলিংক। অত্যাবশ্যকীয় কার্যক্রম নিজস্ব কর্মী দিয়ে পরিচালনার লক্ষ্য থেকেই মূলত এ সিদ্ধান্ত নেয় অপারেটরটি। আলজেরিয়ায় ভিওনের প্রতিষ্ঠান ডিজেজিতেও গত বছর কর্মী সংখ্যা কমিয়ে আনার কার্যক্রম শুরু হয়।

যোগাযোগ করা হলে এ প্রসঙ্গে বাংলালিংকের হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশন্স আসিফ আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলালিংক ও ভিওনের জন্য বাংলাদেশ সবসময়ই বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য। সর্বশেষ সফরেও বাংলাদেশের বাজারে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন ভিওনের সিইও জ্যঁ-ইভ শাহলিয়ে। তবে এজন্য তরঙ্গপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে অনুরোধ করেছি আমরা। পাশাপাশি টাওয়ারগুলো বিক্রির সুযোগ দিতে অনুরোধ জানিয়েছি। এতে তরঙ্গ কিনতে ও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে আরো বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে বাংলালিংক। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সবার জন্য সমতাসূচক একটি ক্ষেত্র নিশ্চিত করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে ডিজিটাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলালিংক। ইন্টারনেট, স্মার্টফোনসহ ডিজিটাল সেবার প্রতি গুরুত্ব দিতেই এ রূপান্তর হচ্ছে। আগামী দিনগুলোয় স্মার্টফোনের ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি ডিজিটাল নানা সেবার চাহিদাও বাড়বে। এসব বিবেচনায় নিয়েই ডিজিটাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে বাংলালিংক। তবে এজন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ।

২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে সেবা টেলিকমের শতভাগ শেয়ার কিনে নেয় মিসরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওরাসকম টেলিকম হোল্ডিংস (ওটিএইচ)। পরের বছর বাংলালিংক ব্র্যান্ড নামে সেবা চালু করে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১১ সালে ওটিএইচের সিংহভাগ শেয়ার কিনে নেয় ভিম্পেলকম। আর ২০১৩ সালে ওটিএইচের নাম পরিবর্তন করে গ্লোবাল টেলিকম হোল্ডিংস (জিটিএইচ) ও ওরাসকম বাংলাদেশ লিমিটেডের নাম বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশন্স লিমিটেড রাখা হয়। চলতি বছর ভিম্পেলকমও নাম পরিবর্তন করে হয়েছে ভিওন। বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার লক্ষ্যে নতুন এ নামকরণ বলে দাবি করা হচ্ছে।

Comments

comments

SHARE