বাংলাদেশ দক্ষিণ কোরিয়ায় শ্রমবাজার হারাচ্ছে

0
117

এশিয়ার ‘টাইগার ইকোনমি কান্ট্রি’ হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটিতে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারে দেশভিত্তিক কোটা পূরণ করতে পারছেনা বাংলাদেশ। এমনকি ভবিষ্যতে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

এর কারণ হিসেবে সিউলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জুলফিকার রহমান বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যেমে কিছু কারণ জানান। তার মতে, কোম্পানি থেকে দেয়া ফ্রি খাবারে অনভ্যস্ততার কারণে অনেকে কোরিয়াতে টিকতে পারে না। আবার কখনো সামান্য বাড়তি অর্থের লোভে কোম্পানি বদলের হিড়িক রীতিমতো হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে কোরিয়ায় বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারকে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাংলাদেশসহ মোট ১৫টি দেশ থেকে কর্মী নেয় কোরিয়া, যার পুরো প্রক্রিয়া হয় অনলাইনে।

কোরিয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকারখানার মালিকদের বিভিন্ন এসোসিয়েশন রয়েছে। তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ডাটাবেজ থেকে মালিকরা তাদের প্রয়োজন অনুসারে কর্মী নেন। অনলাইন ডাটাবেজ এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেম (ইপিএস) স্কিমের আওতায় কোরিয়ান মালিকপক্ষ বাংলাদেশ থেকে বা অন্য যেকোন দেশ থেকে কর্মী নিতে পারে। আর এটা পুরোটাই তাদের নিয়ন্ত্রণে।

দক্ষিণ কোরিয়াতে বর্তমানে প্রায় ১৫-১৬ হাজার বাংলাদেশি রয়েছে। তার মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই গেছে এই ইপিএস স্কিমের মাধ্যমে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের জন্য কোরিয়ায় ৩ হাজার কর্মীর কোটা নির্ধারিত থাকলেও তার এক-তৃতীয়াংশই পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। এর কারণ হিসেবে রাষ্ট্রদূত জুলফিকার রহমান সংবাদ মাধ্যমে জানান, বিভিন্ন কোম্পানির মালিকের বক্তব্য হচ্ছে, বাংলাদেশের কর্মীরা হালাল-হারামের প্রশ্ন তুলে অনেক খাবারই খেতে চায়না। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যেহেতু কোরিয়াতে চিকিৎসার পাশাপাশি কর্মীদের থাকা-খাওয়া সব কিছুই মালিকপক্ষ বহন করে তাই এ ধরনের ঘটনায় বাংলাদেশিদের নিয়ে তারা বেশ বিব্রত বোধ করেন। আবার কিছু কোম্পানি বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় হালাল ক্যাটারিং সার্ভিস থেকে খাবার সরবরাহ করে থাকেন। তবে এ ধরনের কোম্পানির সংখ্যা খুবই কম।

আবার কোন কোন ক্ষেত্রে মালিক মাস শেষে বেতনের সাথে খাবারের জন্য আলাদা অর্থ দেয় এবং কর্মীরা যার যার ডরমিটরিতে নিজেদের মতো করে রান্না করে খান। এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শুধু এই খাবার ইস্যুতে কোরিয়ায় প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ কোম্পানিতে বাংলাদেশি কর্মীরা অসন্তোষ নিয়ে কাজ করে।

ইপিএস স্কিমের আওতায় কোরিয়াতে বাংলাদেশ থেকে যারা কোরিয়াতে যান তাদের মাসিক গড় বেতন ১৮ থেকে ২০ লাখ কোরিয়ান উয়ান। ইউএস ডলারের হিসেবে মাসে যা প্রায় ১৫শ’ থেকে ১৭শ’ ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা । থাকা-খাওয়া-চিকিৎসা সব ফ্রি হওয়ায় প্রায় সব বাংলাদেশিই গড়ে প্রতি মাসে ১৪-১৫শ’ ডলার সঞ্চয় করতে পারেন। মালিকেরা প্রতি বাংলাদেশি কর্মীর পেছনে প্রায় হাজার ডলার ব্যয় করে নির্ধারিত সময়ের চুক্তিতে কোরিয়া নিয়ে যায়। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্যি, কিছুদিন কাজ করার পরই ১ থেকে দেড়শ’ ডলার বাড়তি বেতনের লোভে অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যায় অনেক বাংলাদেশি । অনেকেই আবার শুধু কোম্পানির দেয়া খাবার খেতে না পারায় চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে আসে।

সামান্য বেশি বেতনের লোভে এসব কর্মীদের চুক্তি ভঙ্গ করে অন্য চাকরিতে যোগ দেয়ার ফলে প্রোডাকশন চালু রাখাসহ তাৎক্ষণিক নতুন লোক নেয়ার ঝামেলায় পড়তে হয় কোম্পানির মালিকদের। বাংলাদেশি কর্মীদের এ ধরণের কর্মকান্ড গত কয়েক বছরে কোরিয়ান মালিকদের বেশ বিপদে ফেলে দিয়েছে। ফলে ইদানিং দেশটির চাকরিদাতাদের অনেকেই আর বাংলাদেশি কর্মী নিতে চাননা। এখন নেপাল-শ্রীলংকা-ইন্দোনেশিয়া থেকেই তারা বেশি কর্মী নিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যদি এভাবে চলতে থাকে তাহলে অদূর ভবিষ্যতে কোরিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধও হয়ে যেতে পারে।

Comments

comments