চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে টানা ১৯ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর জঙ্গিবিরোধী অভিযান।

0
117
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে টানা ১৯ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নারীসহ চার জঙ্গি ও এক শিশু নিহত হয়েছে। আত্মঘাতী বিস্ফোরণে এক নারীসহ দুই জঙ্গির হাত-পা ও মাথা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশ পাশের বাড়ির ছাদে ও মাঠে গিয়ে পড়েছে।
অভিযান শেষ হওয়ার সাড়ে ছয় ঘণ্টা পর গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটায় ‘ছায়ানীড়’ নামের ওই বাড়ির ছাদের সিঁড়িঘরে নারী জঙ্গির লাশের টুকরার পাশে এক শিশুর লাশ পাওয়া যায়। শিশুটির বয়স পাঁচ-ছয় মাস হতে পারে। শিশুটি ওই নারী জঙ্গির হতে পারে বলে জানান সীতাকুণ্ড সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজাউর রহমান।
গত বুধবার বেলা সাড়ে তিনটা থেকে বাড়িটি ঘিরে রাখে পুলিশ। এরপর গতকাল সকাল ছয়টায় ছায়ানীড়ের ভেতরে পুলিশের সোয়াট (স্পেশাল উইপনস অ্যান্ড ট্যাকটিকস) বাহিনীর নেতৃত্বে মূল অভিযান শুরু হয়। এর নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন অ্যাসল্ট সিক্সটিন’। অভিযান শুরুর তিন ঘণ্টা পর সকাল সাড়ে নয়টায় বাড়ি থেকে প্রথম একটি শিশুকে বের করে আনা হয়। এরপর একে একে আটকে পড়া তিনটি পরিবারের ২০ জনকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। অভিযানের ব্যাপ্তি ছিল চার ঘণ্টা।
অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের চারজন সদস্য আহত হয়েছেন। তাঁরা হলেন সোয়াটের চট্টগ্রাম নগরের সদস্য ও অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মির্জা সায়েম মাহমুদ, ঢাকা সোয়াটের সদস্য কনস্টেবল শরীয়ত হাসান ও মোহাম্মদ আসিব এবং ফায়ার সার্ভিসের কর্মী মঈন উদ্দিন। আহত শরীয়ত ও আসিবকে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়েছে। বাকি দুজন সীতাকুণ্ড ও চট্টগ্রামে চিকিৎসা নেন।
বুধবার বিকেলে বাড়িটির কাছে যাওয়ার পরই পুলিশকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড ও গুলি ছুড়ে মারে জঙ্গিরা। তখন স্প্লিন্টারের আঘাতে আহত হন সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোজাম্মেল হক।
ছায়ানীড় বাড়িটি দোতলা। এর অবস্থান সীতাকুণ্ড পৌরসভার প্রেমতলা চৌধুরীপাড়া এলাকায়। বাড়িটির ১০০ গজের মধ্যে আরও দুটি বাড়ি রয়েছে। বুধবার ওই বাড়ির এক কিলোমিটার পশ্চিমে পৌরসভার আমিরাবাদ এলাকার ‘সাধন কুটির’ নামে আরেকটি বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে গ্রেপ্তার হওয়া দুই জঙ্গির (স্বামী-স্ত্রী) কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ছায়ানীড়ে অভিযান শুরু করে পুলিশ। এরপর থেকে দফায় দফায় পুলিশকে লক্ষ্য করে হাতবোমা ও গুলি ছোড়া হয়।
এর আগে গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর রাজধানীর আশকোনার ‘সূর্য ভিলা’য় জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিজের শরীরে বেঁধে রাখা বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হন আরেক নারী জঙ্গি। আশকোনায় ১৬ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে নিহত হন ওই নারীসহ দুজন।
যেভাবে অভিযান
সকাল ছয়টায় পাশের দোতলা বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে ছায়ানীড়ের ছাদে যান সোয়াট দলের সদস্যরা। অভিযানের শুরুর বর্ণনা শোনা যাক সোয়াট দলের সদস্য ও চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) লিয়াকত আলীর মুখ থেকে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ছায়ানীড়ের ছাদের সিঁড়িঘর দিয়ে ঢোকার মুহূর্তেই এক নারীসহ তিন জঙ্গি তাঁদের ওপর বোমা হামলার চেষ্টা করে। এ সময় গুলি ছোড়া হলে এক জঙ্গি নিহত হন। এরপরই ‘আল্লাহু আকবর’ বলে তিন জঙ্গি তাঁদের দিকে বোমা ছুড়ে মারে। তাঁদের একজন ছিলেন নারী। তাঁর কোমরে সুইসাইড ভেস্ট (বিস্ফোরকভরা বন্ধনী) ছিল। তিনি সেটির বিস্ফোরণ ঘটান। তাঁর বয়স ২৭ বা ২৮ হবে। পরনে কালো বোরকা ছিল।
অভিযানের সময় প্রথম আলোর প্রতিবেদক ছায়ানীড়ের ৫০০ গজ দূরে একটি বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। সেখান থেকে ছায়ানীড়ের ছাদ দেখা যায়। অভিযান শুরুর পর সকাল সোয়া ছয়টায় প্রথমে গুলির শব্দ শোনা যায়। এর সাত মিনিট পর আবারও পরপর চারটি গুলির শব্দ আসে। ৬টা ২৮ মিনিটে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শোনা যায়। মুহূর্তেই ওই বাড়ির সিঁড়িঘরের ছাদের টিন উড়ে যায়। এ সময় ১৫ থেকে ২০ ফুট উঁচু আগুনের শিখা দেখা যায়। বাড়িটি ধোঁয়াচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এরপর ৬টা ২৮ থেকে ৩৬ মিনিট পর্যন্ত গুলির শব্দ শোনা যায়। এর দুই মিনিট পর অভিযানে অংশ নেওয়া সোয়াট দলের দুই সদস্যকে অ্যাম্বুলেন্সে করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান পুলিশের অন্য সদস্যরা। ৭টা ১০ মিনিটে দুটি গুলির শব্দ হয়। এরপর আর কোনো গুলির শব্দ শোনা যায়নি। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ভবনের পেছনে জানালার গ্রিল কেটে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ওই বাসায় আটকে থাকা এক শিশুকে বের করে আনেন। এরপর একে একে অন্যরাও পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সঙ্গে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের একজন মোহাম্মদ শাহাদাৎ সাংবাদিকদের বলেন, জঙ্গিরা তাঁদের জিম্মি করেনি। উদ্ধার হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁরা তীব্র উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ছিলেন।
সকাল সাড়ে ১০টায় বাড়ি থেকে ৫০০ গজ দূরে রাস্তার পাশে অভিযানের বিষয়ে সাংবাদিকদের আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, দোতলা বাড়ির ভেতরে আটকে পড়া ব্যক্তিদের নিরাপদে বের করে আনার জন্য সকাল ছয়টায় অভিযান শুরু করা হয়। অভিযানকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছোড়া গুলিতে এক জঙ্গি নিহত হয়। বাড়ির ভেতরে থাকা জঙ্গিরা আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে তিন জঙ্গি নিহত হয়।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি বলেন, নিহত চার জঙ্গির মধ্যে দুজনের হাত, পা ও মুখমণ্ডল বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। তাদের চেহারা বোঝার উপায় নেই। বাকি দুজনের চেহারা কিছুটা বোঝা যাচ্ছে। গত বুধবার থেকে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত পুলিশের তিন ও ফায়ার সার্ভিসের এক সদস্য আহত হয়েছেন।
ডিআইজি বলেন, বাড়ির ভেতরে থাকা সব জঙ্গি নিহত হয়েছে। জঙ্গিরা যে ফ্ল্যাটে অবস্থান করছিল, সেখানে বিস্ফোরক রয়েছে। বাড়ির ভেতরে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল কাজ করছে। তিনি বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের আশপাশে বড় বড় উন্নয়নকাজ চলছে। সেখানে অনেক বিদেশি নাগরিক কাজ করছেন। হয়তো তাঁদের টার্গেট করেই এখানে গ্রেনেড ও বিস্ফোরক মজুত করা হয়েছিল। পুলিশ নিশ্চিত, এরা নিষিদ্ধঘোষিত উগ্র জঙ্গি সংগঠন ‘নব্য জেএমবি’র সদস্য।অভিযান শেষে গতকাল বেলা ১১টার দিকে বাড়িটিতে প্রবেশ করে চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল। বিকেল পর্যন্ত দলটি দুটি বোমা ও দুটি সুইসাইড ভেস্ট ধ্বংস করে। দুপুরে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় সিআইডি চট্টগ্রামের ক্রাইম সিন ইউনিটের একটি দল। সিআইডির চট্টগ্রাম ফরেনসিক ল্যাবের সহকারী রাসায়নিক পরীক্ষক পিংকু পোদ্দার ঘটনাস্থলে প্রথম আলোকে বলেন, নিহত জঙ্গিদের আঙুলের ছাপসহ বিভিন্ন আলামত ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
বিকেল পৌনে চারটায় ঘটনাস্থলের পাশে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের (ঢাকার) অতিরিক্ত উপকমিশনার ছানোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, অভিযানের সময় তাঁরা দেখতে পান, বাড়ির প্রবেশমুখে বোমা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে। প্রধান ফটকের ঢোকার পথে বোমা ছিল। জঙ্গিদের ফ্ল্যাটে বিভিন্ন ধরনের পাইপের টুকরা, সুইচ, অ্যাসিড থেকে শুরু করে বিভিন্ন তরল রাসায়নিক পাওয়া গেছে। উদ্ধার করা বিভিন্ন সরঞ্জাম দিয়ে ৪০ থেকে ৫০টি বোমা বানানো যেত।
ছানোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, রাজধানীর আশকোনা, আজিমপুর ও নারায়ণগঞ্জের অভিযানে দেখা গেছে, জঙ্গিদের মধ্যে কোনো সদস্য আত্মঘাতী হয়ে পুলিশকে মারার চেষ্টা করেছে। বিস্ফোরিত আত্মঘাতী বোমাটি অনেক শক্তিশালী। এ ধরনের বোমা আগের কোনো অভিযানে দেখা যায়নি। এ ছাড়া একই সঙ্গে চারজনকে আত্মঘাতী হতেও দেখা যায়নি।
ছায়ানীড়ের জঙ্গিরা
চার ফ্ল্যাটের দোতলা বাড়িটির মালিক অলিউল্লাহ বছরখানেক আগে মারা যান। তাঁর দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলে মহিউদ্দিন গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থলে প্রথম আলোকে বলেন, দেড় মাস আগে কক্সবাজারের রামুর বাসিন্দা পরিচয় দিয়ে দুই নারী ও দুই পুরুষ ছয় হাজার টাকায় নিচতলার একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়। ভাড়া নেওয়ার পর তাদের (জঙ্গি) সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি। তাদের নামও তিনি জানেন না। তারা (জঙ্গিরা) জাতীয় পরিচয়পত্র তাঁর মায়ের কাছে দিয়েছিল। তিনি (মহিউদ্দিন) চট্টগ্রাম নগরের ফয়’স লেক এলাকায় থাকেন। সেখানে এক বন্ধুর সঙ্গে ব্যবসা করেন। গতকাল বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া ২০ জনের মধ্যে তাঁর মা রেহানা বেগম ও ছোট ভাই নাছির উদ্দিন রয়েছেন।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি সাংবাদিকদের বলেন, বাড়ির মালিক রেহানা বেগম ও তাঁর ছেলে মহিউদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে থানায় নেওয়া হয়েছে।
গ্রেনেডসহ আটক স্বামী-স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ
গত বুধবার সীতাকুণ্ড সদরের আমিরাবাদ এলাকার সাধন কুটির থেকে তিনটি হ্যান্ড গ্রেনেড, সুইসাইড ভেস্ট, পিস্তল, বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ গ্রেপ্তার জসিম ও আরজিনাকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত সীতাকুণ্ড থানায় কোনো মামলা হয়নি।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি সাংবাদিকদের বলেন, গ্রেপ্তার দুজন মুখ খুলছেন না। তাঁদের কাছ থেকে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

Comments

comments

SHARE