এখনো রোধ করা সম্ভব হয়নি ফরমালিন

0
96

আমরা খাবার যা-ই খাই না কেন, মনে হয় বিষ খাচ্ছি। আর মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ফরমালিনের দৌরাত্ম্য আমরা এরই মধ্যে দেখেছি। রাজধানীর বাজারগুলোয় তো বটেই, দেশের বাইরে সর্বত্রই ফরমালিনযুক্ত খাবার। কিছুতেই ফরমালিন নামক এ বিষের বিস্তার রোধ করা যাচ্ছে না।
ফলমূল, মাছ, মাংস ও খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন ব্যবহারের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান চালানো হলেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের নিবৃত্ত রাখা সম্ভব হচ্ছে না নকল-ভেজালের দুষ্কর্ম থেকে। আতঙ্কগ্রস্তÍ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতে রাজধানীতে গড়ে উঠছে একের পর এক ফরমালিনমুক্ত বাজার। বলা হচ্ছে, প্রতিটি পণ্য পরীক্ষা করে এসব বাজারে ঢোকানো হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে তথাকথিত ফরমালিনমুক্ত বাজারেও রাসায়নিক মিশ্রিত পণ্যের বেচাকেনা চলছে। ফরমালিনমুক্ত পণ্য এ অজুহাতে অতিরিক্ত দাম রাখা হলেও ক্রেতারা টাকা দিয়ে কার্যত কিনছেন মৃত্যুপরোয়ানা। 
দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। উৎপাদনে এসেছে আধুনিকতা। মাঠে উৎপাদন বেড়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে চাষাবাদ লাভজনক হয়ে উঠেছে। কৃষি বাজার ব্যবস্থাপনায়ও এসেছে নতুনত্ব। নতুন নতুন ফসলের প্রতি কৃষকের আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে। নতুন নতুন ফসল বাজারে আসছে। একই মাঠে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। নতুন নতুন গবেষণা থেকে দেশের কৃষি উৎপাদনে রীতিমতো বিপ্লব এসেছে বলা যেতে পারে। ভবিষ্যতে আরও উন্নতির আশা করছে বাংলাদেশ। 
শুধু ধান কিংবা গম নয়, বিভিন্ন জাতের মৌসুমি সবজি উৎপাদনেও এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। দেশের বিভিন্ন স্থানে সবজি চাষ করেও লাভবান হচ্ছেন কৃষক। এর পাশাপাশি পশু পালনও এখন গ্রামাঞ্চলে পেশা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। পশু পালন আমাদের অর্থনীতিতে গতি এনেছে, পুষ্টি চাহিদাও পূরণ করছে।
খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে কী খাচ্ছি আমরা? এ প্রশ্নটা এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে জমিতে সার ও কীটনাশকের ব্যবহার। কীটনাশক ব্যবহার করতে গিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কৃষক মাত্রা না বুঝে মাঠে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করে থাকেন। মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে অনেক সবজিই খাওয়ার অযোগ্য হয়ে যায়। 
ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় ১০টি শিমের নমুনার মধ্যে চারটিতে, কাঁচামরিচের ১৫টি নমুনার মধ্যে চারটি, আলুর ১২টি নমুনার মধ্যে তিনটিতে মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক পাওয়া গেছে। টমেটোর ১৬টি নমুনা ও বেগুনের ১০টি নমুনার একটিতেও কীটনাশক পাওয়া না গেলেও শুঁটকির ১৮টি নমুনার মধ্যে তিনটিতে ও দুইটি ব্র্যান্ডের হলুদের গুঁড়ায় মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক পাওয়া গেছে। 
অন্যদিকে বারির গবেষকরা কুমিল্লা, জামালপুর, নরসিংদী, বগুড়াসহ বিভিন্ন এলাকার বাজার থেকে চিচিঙ্গা, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, পটোল, বেগুন, শসা, ঢেঁড়স, করলা ও ধনেপাতার মোট ৩৬২টি নমুনা পরীক্ষা করেন। এর মধ্যে ২৩ শতাংশে মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক পাওয়া যায়। শুঁটকির ৪৩টি নমুনার ৭৪ শতাংশে, চিংড়ির ৪৯টি নমুনার সাতটিতে কীটনাশক পাওয়া গেছে। সবজিতে ডাইমেটওয়েট, এসিটামিপ্রিড ও মেথালিক্সিন জাতীয় কীটনাশক বেশি পাওয়া গেছে। হলুদের গুঁড়ায় পাওয়া গেছে ক্লোরেপাইরিফিস নামের কীটনাশক। তবে শুঁটকিতে অ্যালড্রিন ও ডিডিটি পাওয়া গেছে।
ডিডিটির ব্যবহার সারা বিশ্বে নিষিদ্ধ। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে দেশের জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়বে। ভবিষ্যতে সবজি রফতানিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কীটনাশকের এ ব্যবহার। শুধু সবজি নয়, ভোজ্যতেল এবং মাংসও ক্ষতিকর হয়ে পড়েছে মানবদেহের জন্য। ভোজ্যতেলে মেশানো হচ্ছে ভিটামিন ‘এ’। কিন্তু সবার জন্য এই তেল প্রযোজ্য নয়। অধিক মুনাফার কারণে নানারকম ওষুধ প্রয়োগে গরু মোটাতাজা করা হয়। এই মোটাতাজা গরুর মাংস খেলে মানুষের কিডনি, লিভার, হৃৎপি-সহ অন্যান্য অঙ্গ ক্ষতির মুখে পড়ে।
কয়েক বছর ধরে আমাদের দেশে খাদ্যে ফরমালিনসহ রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ে হৈচৈ হচ্ছে। উচ্চ আদালত থেকেও এ মর্মে কিছু নির্দেশনা এসেছে। খাদ্যে ফরমালিন এখন এক ভয়াবহ আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে। মর্গে মানুষের লাশ ও গবেষণাগারে প্রাণীর মৃতদেহ সংরক্ষণে যে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়, সে ফরমালিন এখন ব্যবহার করা হচ্ছে খাদ্যদ্রব্যের পচন রোধ করার কাজে। মাছ বিক্রেতারা মাছের পচন রোধ করার জন্য ফরমালিন ব্যবহার করছেন। একইভাবে দুধ যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্যও ফরমালিন ব্যবহার করা হচ্ছে। ইদানীং মাংসেও নাকি ফরমালিন ব্যবহার হচ্ছে। অথচ এ ফরমালিন মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর। 
ফরমালিন মানবদেহে ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে, কিডনি, লিভার ও শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। উন্নত বিশ্বে শুধু খাদ্যে নয়, অন্যান্য সামগ্রীতেও এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কারণ নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি ফরমালিনযুক্ত দ্রব্যের সংস্পর্শে থাকলে অ্যালার্জি, শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ নানাবিধ শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে এর আমদানি ও ব্যবহার চলছে অবাধে। তার বিরূপ প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যের ওপর। আদালতের নির্দেশনাগুলোর মধ্যে ছিল বন্দরগুলোতে রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো ফল আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা, বাজারের আড়তগুলোতে প্রতিদিন ফলের রাসায়নিক পরীক্ষা করা ও দোষীদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা ইত্যাদি। কিন্তু এসব নির্দেশনার যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। 
ফরমালিনসহ ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগের অভাবে অপরাধীরা যা ইচ্ছা তাই করার সুযোগ পাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য জিম্মি হয়ে পড়েছে অসৎ ব্যবসায়ীদের কাছে। এ অবস্থার প্রতিকার ঘটাতে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত হওয়া দরকার। ফরমালিন ব্যবহারকারীদের কঠোর শাস্তিই তাদের অপরাধপ্রবণতায় বাদ সাধতে পারে

Comments

comments

SHARE