আমিরাতের শ্রমবাজার শুধু নারী কর্মীদের জন্য আরব উন্মুক্ত probashi news

0
126

মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে আধুনিক দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত। মরুময় এই দেশটি একসময় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার ছিলো। তবে সঠিক কোনো কারণ ছাড়াই গত চার বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ থেকে পুরুষ শ্রমিক নেওয়া বন্ধ রেখেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। কিন্তু পুরুষ শ্রমিক নেওয়া বন্ধ রাখলেও দেশটি বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত নারী শ্রমিক নিচ্ছে। অর্থাৎ দেশটি বাংলাদেশ থেকে নারী শ্রমিক নেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। পুরুষ শ্রমিকদের জন্য নতুন কোন জায়গা তৈরি হচ্ছে না। তারপরও খুবই অল্প কিছু পুরুষ শ্রমিক যাচ্ছে বিভিন্ন কৌশলে।
জনশক্তি ,কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিয়েছেন ২ লাখ ৭২ হাজার ৯৭৩ জন শ্রমিক। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গেছেন মাত্র ১ হাজার ১২৩ জন। যার মধ্যে ৯৪২ জনই নারী শ্রমিক , পুরুষ শ্রমিক মাত্র ১৮১ জন। এই অবস্থা শুধুমাত্র এই তিন মাসের জন্য নয়, বিগত চার বছরেরও বেশি সময় ধরে একই অবস্থা চলছে দেশটিতে।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী আরও জানা যায়, ২০১৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে মোট শ্রমিক গিয়েছিলো ১৪ হাজার ২৪১ জন। এর মধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ১৩ হাজার ৭১০। পুরুষ শ্রমিক গেছেন মাত্র ৫৩১ জন। ২০১৪ সালে দেশটিতে যাওয়া মোট শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ২৩২। এর মধ্যে পুরুষ শ্রমিক মাত্র ১ হাজার ১৮ জন, বাকিরা সবাই নারী। ২০১৫ সালে দেশটিতে শ্রমিক গেছেন ২৫ হাজার ২৭১ জন। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা মাত্র ৯৬৪।
অন্যদিকে গত বছর মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতে মোট শ্রমিক যায় ৮ হাজার ১৩১ জন। এর মধ্যে নারী শ্রমিক ছিলো ৫ হাজার ১৫১ ও পুরুষ শ্রমিক ২ হাজার ৯৮০ জন। অথচ চার বছর আগে তাকালে দেখা যায় পুরোই উল্টো চিত্র। ২০০৬ থেকে ১২ সাল পর্যন্ত ইউএইর শ্রমবাজারে প্রতি বছর পুরুষ শ্রমিক গেছে দুই থেকে চার লাখেরও বেশি। ২০১২ সালে দেশটিতে যাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৫২। এর মধ্যে ২ লাখ ৯ হাজার ২৪২ জনই পুরুষ শ্রমিক। এর বিপরীতে নারী শ্রমিক ছিলেন ৬ হাজার ২১২ জন।
বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে এই অবস্থা সর্ম্পকে বলতে গিয়ে জনশক্তি রপ্তানী বিশ্লেষক ও ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরন বলেন, অনেকদিন ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাত নিয়মিত মহিলা কর্মী নিলেও পুরুষ কর্মী নেওয়া একেবারে বন্ধ রেখেছে। তিনি বলেন, পুরুষ কর্মী না নেওয়ার সঠিক কোনো কারণ এখনো ব্যাখ্যা করতে পারেনি আমিরাত সরকার। এছাড়াও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ও এ প্রসঙ্গে কোনো কিছু বলা হয়নি।
তবে হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরন মনে করেন, এক সময় প্রচুর পরিমানে অবৈধ শ্রমিক সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রবেশ করেছে, এই অবৈধ শ্রমিক প্রবেশ বন্ধ করতে এ সিদ্ধান্ত নিতে পারে দেশটি। এছাড়াও ২০২০ সালের ওয়ার্ল্ড এক্সপোর আয়োজক নির্বাচনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) চেয়ে রাশিয়াকে গুরুত্ব দিয়েছিলো বাংলাদেশ। যার কারণেও হয়তো বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করে দেয়া হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। রাশিয়াকে গুরুত্ব দেওয়াটা আমিরাত সরকার ভালোভাবে নেয়নি বলে মনে করছেন হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরন।
ইউএইর শ্রমবাজার পুরোদমে চালুর চেষ্টা চলছে কয়েক বছর ধরেই। এরই অংশ হিসেবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি শিগগিরই একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে আরব আমিরাত সফরের কথা রয়েছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কূটনৈতিক তৎপরতার ব্যর্থতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এ শ্রমবাজার এত বছর ধরে বন্ধ রয়েছে বাংলাদেশের জন্য। নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা না হলেও বাংলাদেশি পুরুষ শ্রমিকদের সেভাবে সুযোগ দিচ্ছে না দেশটি। আর এর ফলে ইউএইর নির্মাণ ও শিল্প উৎপাদনসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো চলে যাচ্ছে ভারতীয় ও নেপালি শ্রমিকদের দখলে। এক্ষেত্রে শুধু সরকার নয়, পাশাপাশি জনশক্তি রপ্তানিকারক সংগঠনগুলোরও কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশী কর্মী পাঠানোর বিষয়ে গত বছরের ১৭ অক্টোবর ইউএইর এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকা সফরকালে শ্রমবাজার উন্মুক্তের বিষয়ে আশ্বাস দিয়ে যায়। সে মোতাবেক আশা করা যাচ্ছে, শিগগিরই দেশটিতে কর্মী পাঠানো শুরু হবে।’ এ বিষয়ে হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরন বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এখনো কর্মী নেওয়ার বিষয়ে কোনো আশার আলো দেখা যায়নি। তিনি আরও বলেন দুই মাস আগে, আরব আমিরাত থেকে সিটি অ্যান্ড গিল্ডস নামে একটি ইংল্যান্ড ভিত্তিক বেসরকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে এসেছিলো। এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রশিক্ষণকেন্দ্র ঘুরে দেখেছে এবং তারা বাংলাদেশের কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক মতামত দিয়েছে। তবে তিনি বলেন, আমিরাত কতৃপক্ষ ই প্রতিষ্ঠানটির মতামত কতটা গ্রহন করবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরন আরও বলেন, আমাদের দক্ষ শ্রমিক তৈরি করতে হবে। কারণ এরইমধ্যে, বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নেওয়া শুরু করেছে। আবার খুব অল্প করে হলেও ইরাকের শ্রমবাজারেও প্রবেশ করা শুরু করেছে বাংলাদেশিরা। তাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজার মহিলা কর্মীদের পামাপাশি পুরুষদের জন্য আবার খুলে দেয়ার ব্যবস্থা করতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া দরকার বলে মনে করেন এই জনশক্তি রপ্তানি বিশ্লেষক।

Comments

comments

SHARE