আটক অসংখ্য বাংলাদেশি নারী সৌদিতে নির্লিপ্ত দূতাবাস

0
146

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশ সৌদি আরব। বর্তমানে সৌদি আরবে পুরুষ কর্মীর চেয়ে মহিলা কর্মীর চাহিদা বেশি। দশ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে গৃহকর্মী নেওয়ার ব্যাপারে চুক্তি হয় সৌদি আরবের সাথে। সেই থেকে দেশটিতে প্রতিবছর ১০ থেকে ১২ হাজার নারী কর্মী পাঠাচ্ছে বাংলাদেশ। যে দেশে পুরুষ কর্মী টাকা খরচ করে যাওযার জন্য উদগ্রীব থাকে সেখানে বিনা খরচেও চাহিদা অনুযায়ী নারীকর্মী পাঠাতে পারছে না বাংলাদেশ। তার প্রধান কারণ বাংলাদেশের নারী কর্মীরা সৌদি আরবে গিয়ে নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। এমনকি তাদের বেতনও ঠিকমতো দেয়া হয়না। চাইতে গেলে বা প্রতিবাদ করলে ভয়াবহ নির্যাতন নেমে আসে তাদের ওপর। কেউ কেউ আবার মিথ্যা মামলায় বিভিন্ন জাগায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আর অনেকেই বিনা বিচারে অসহনীয় বন্দি জীবন কাটাচ্ছে মাসের পর মাস।

এমনই এক চিত্র দেখা গেছে সৌদি আরবের বাংলাদেশি দূতাবাসের এক সাফারারস নারী ক্যাম্পে। ঐ ক্যাম্পে ২শ ৪০ বাংলাদেশি নারী প্রায় সাত মাস ধরে আটক রয়েছে। খুব কষ্টে দিন পার করেছে তারা। এদের মধ্যেই একজন কুমিল্লা জেলার মেঘনা থানার বাসিন্দা রুজিনা। প্রায় ৬ মাস আগে গৃহকর্মী হিসেবে যায় সৌদি আরবে। কিন্তু গৃহকর্তার নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে যায়। আর এখন জায়গা হয়েছে সাফারার নারী ক্যাম্পে। ভয়েস বাংলা রুজিনার সাথে ফোনে কথা বলতে সক্ষম হয়, উঠে আসে অনেক তথ্য। অসহায় রুজিনা ভয়েস বাংলাকে জানান, প্রায় ৬-৭ মাস ধরে এ ক্যাম্পে অনেক বাংলাদেশি নারী কর্মী আটকে রয়েছে। তারা বিভিন্ন ভাবে অত্যাচর নির্যাতনের শিকার হয়ে অবশেষে এই ক্যাম্পে এসে আশ্রয় নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ দূতাবাস আমাদের দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে না।

দূতাবাসের কাছে কারণ জানতে চাইলে তারা না পাঠানোর সঠিক কোনো কারণ বলেছে না। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সমস্যার কথা দূতাবাস কর্মকর্তাদের কাছে বললে তারা বলে, এ সমস্যা নাকি আমাদের নিজেদের জন্যই হয়েছে। এখানে দূতাবাস কোনো দায়িত্ নিতে পারবে না‘। আটক রুজিনা বলেন, এ ক্যাম্পের ৩০ জন রয়েছে যাদের বিরুদ্ধে কফিল অর্থাৎ সৌদি মালিক মিথ্যা মামলা দিয়েছে। রুজিনাও তার মধ্যে একজন। তিনি বলেন, মিথ্যা মামলার কারণে তারা দেশে ফেরত যেতে পারছে না। এমনকি দূতাবাস তাদের এ মামলা খারিজ করার জন্য কোনে প্রকার সাহায্য সহযোগিতা করছে না। তিনি অভিযোগ করেন, ‘দূতাবাস আমাদের এই মামলার জন্য কোরটেও(বানানটা ছিক করে দিও) নিয়ে যাচ্ছে না। যার কারণে এই মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। একদিকে মামলা নিষ্পত্তি করতে কোনো প্রকার সাহায্য করছে না, অন্যদিকে তাদের মামলার কারণে দেশে যেতেও দিচ্ছে না। এখন দেশে ফেরাই আমাদের জন্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে‘।

ক্যাম্পে আটক বিক্রমপুরের হিমু নামে আরেক নারী জানান, ‘গৃহকর্মীর জন্য এদেশে নারী শ্রমিকরা আসলেও তাদের দিয়ে বিভিন্ন অনৈতিক কাজ করাচ্ছে দালালরা। এছাড়াও বাংলাদেশি নারীরা সৌদি আরবে কাজ করতে এসে শারিরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে‘। তিনি বলেন, অনেক বাংলাদেশি নারী ঠিক মতো খাবার ও বেতন পায় না এখানে। তিনি নিজেই আট মাস ধরে বেতন পাননি বলে জানান। শুধু বেতনই নয় তিনবেলা খাবারও ঠিক মতো দেয়া হযনি হিমুকে।

হ্যাপি নামে আরেক বাংলাদেশি জানান, বয়সের ভারে আর কাজ করতে না পারায় কফিল তাকে এই ক্যাম্পে নিয়ে রেখে গেছে। তিনি বাংলাদেশে যেতে চাইলেও তাকে পাঠানোর কোনো ব্যবস্থা করছে না দূতাবাস। তিনি বলেন, ‘দূতাবাসের সাথে যারা দালাল ধরে কাজ করতে পারছে। এমনকি যারা কিছু টাকা খরচ করতে পারছে তাদেরকেই বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে দূতাবাস‘। ক্যাম্পের দুর্দশার চিত্রও তুলে ধরেন হ্যাপি। মাসের পর মাস আটক এই বাংলাদেশি নারী জানান, ‘দূতাবাস দুই বেলা খাবার দেয়। আর সৌদি আরব থেকে ‘বাবার খাবার’ বলে এ খাবার দেওয়া হয়। হ্যাপি বলেন ‘বাবার খাবার’ মানে সৌদির বিভিন্ন রেসটুরেন্টে থাকা অবশিষ্ট খাবারগুলো। এগুলো খেয়ে কোনো রকমে বেঁচে আছেন বলেও জানান তিনি ।

এখানকার বন্দি নারী কর্মীদের অভিযোগ, বাংলাদেশ সরকারের সদিচ্ছার অভাব ও দূতাবাসগুলোর কাজের গাফিলিতিই তাদের দুর্দশার প্রধান কারণ । তারা মনে করেন বাংলাদেশ ছাড়া অন্য দেশের শ্রমিকরা সমস্যায় পড়লে তাদের দূতাবাস নানাভাবে সাহায্য করে। অনেক দ্রুত তাদের দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। কিন্তু আমাদের দেশের দূতাবাস এ ধরনের কোনো সমস্যা সমাধানে একবারেই তৎপর না। যার কারনে প্রচুর নারী কর্মী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে সৌদি আরবে, বন্দি অবস্খায় অসহায় অনিশ্চিত দিন পার করছে ।

Comments

comments

SHARE